স্পিতি থেকে লাদাখ

লেখক : অনির্বান মজুমদার 

Travel Dreams Archive 20 March 2013

স্পিতি থেকে লাদাখ ভাগ ১ ও ২

খুব ভোরে বন্ধুদের ডাকাডাকিতে উঠে পড়লাম,এখুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। কাঁচের জানলায় দিয়ে দেখলাম বাইরে এখন কালো অন্ধকার। লেপ সরিয়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হলাম। বাইরে গাড়ি এসে গেছে ,সবাই মালপত্র গাড়িতে তুলে রওনা হলাম। একটা আবছা কালো অন্ধকার দূরে কালো পাহাড় এর রূপরেখা, এর সাথে ঠাণ্ডা লাদাখি হাওয়া। এখন আমাদের গন্তব্য লে বিমানবন্দর।সবাই খুব চুপচাপ একটানা গাড়ির যান্ত্রিক শব্দ প্রায় ৪৫ মিনিট লাগল লে বিমানবন্দর পৌছতে। এরপর নিয়মমাফিক চেকিং সেরে গো এয়ার বিমানে উঠে পড়লাম। এক সময় বিমান ঊড়লো আকাশে, লে বিমানবন্দর খুব ছোটো চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা। ঘূম জড়ানো চোখে জানলায় চোখ রাখলাম, মেঘের রাজ্যে আমরা বহু নীচে ভূখণ্ড, মনেমনে ভাবছিলাম এতো দিন কোন পথ ধরে হেঁটে এসেছি আমরা। আমার পাশের বন্ধুটির খুব উৎসাহ, সে কাঁচের ভেতর দিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল ওই  জান্সকার আর ওইত সিন্ধু ,আসলে দিন ২০ আগে এমনি ভোরে আমরা পৌঁছেছিলাম চণ্ডীগড়, সেখান থেকে মানালি। এরপর লম্বা জিপ যাত্রায় পরদিন কাজা।

কাজা স্পিতির সদর শহর, এবং বেশ পুরোনো শহর। কাজার প্রাচীন গুম্ফাটি এখানেই ছিল, আজ নেই। নব্বই’র দশকের গোড়ায় গুম্ফাটির সাড়ম্বর পূণঃনির্মাণ হয়েছে। তাওয়াং, রুমটেক, কি হেমিস গুম্ফার মতো এই কাজা গুম্ফাও অবশ্য দ্রষ্টব্যের একটি। তিব্বত সন্নিহিত ভারতের এই মরুপর্বতের দেশটি বহুযুগ ধরে বৌদ্ধদের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য খ্যাত। ধর্মগুরু দলাই লামার প্রিয় প্রার্থনামন্দিরগুলো এখানেই আছে। এখানে সন্যাসরত শিক্ষার্থীরা লামার আশীর্বাদধন্য। স্পিতি শব্দের মধ্যভুমি তিব্বত ও ভারতের মাঝখানে স্পিতি ভৌগলিক কারনে তো বটেই, যেন ধর্মকৃষ্টিরও সেতুভূমি। আজ রাজ্যের কাজ। ব্রেকফাস্ট সেরে ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। ওদিকে বাজারে বিস্তর কেনাকাটা।সুস্মিতকে নিয়ে আমি ছুটলাম ডি-এম অফিসে, আর সবাই বাজারের দিকে। ওদের হাজারো কাজ। আমাদের কাজ সামান্য, লাদাখ যাবার ইনার-লাইন পারমিট আদায়। কিন্তু সামান্য কাজের জন্য পাঁচবার চরকি পাক খেতে হল নরবোলিং, অফিস, বাজার, আবার অফিস। সে সব বৃত্তান্ত নিজের কাছেই বিরক্তিকর।আসলে ডিএম অফিসে ভিনদেশিদের ভিড় ছিল, এসময় থাকেও।এবং ওদের ক্ষেত্রে পারমিট পদ্ধতি আমাদের মতো এত সরল নয়।

পাসপোর্ট ইত্যাদি কাগজপ্ত্র খুঁটিয়ে স্ক্যান না করে, জিজ্ঞাসাবাদ না করে কিছু করা যায় না। ঐ একই ডেস্ক থেকে স্বদেশিদের কাগজও বেরোবে। ফলে আমাদের অপেক্ষা করতে হ’ল, এবং অপেক্ষার পরে জানা গেল বেশ কিছু কাগজ চাই, সইসাবুদ চাই। বললাম, সব জোগান দেব, কিন্তু আজ দুপুরের মধ্যে পারমিট চাই। নরবোলিং’এ ফিরে কোনোমতে লাঞ্চ করে কপাল ঠুকে বেরিয়ে পড়ি। গাড়ি চলে স্পিতি নদীর অনুকুলে হিন্দুস্থান-তিব্বত রোড ধরে দক্ষিণমুখে। কাজা থেকে ঢনকর ৩৯ কিমি রাস্তা। প্রথম বিশ কিমি ছোটা শেষ হ’লে রাস্তা ঘুরে যায় উত্তরপূব দিকে, এবং দ্রুত প্রায় চৌদ্দ হাজার ফুট উঁচুতে নিয়ে যায়। আবার মাথা ঢিপঢিপ শুরু হয়। তবে স্বর্ণগৈরিক মরুদেশে বিরল ভাস্কর্যে অহঙ্কারী পিরামিড পর্বত, নদী সমতলে সামান্যসবুজের প্রাণচিহ্ন, দিগন্তে কিন্নর, কুঞ্জুম, জাঁসকার হিমালয়ের হাতছানি আমাদের মুক করে রাখে।

দুপুর সোয়া তিনটে, সূর্যকরোজ্জ্বল পাহাড়শিরে গুম্ফার প্রার্থনানিশান উড়ছে। পৃথিবীর প্রাচীন স্থাপত্যের একটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। প্রকৃতির খেয়ালি ইমারতের গায়ে মানুষের দুরনিবার শ্রম মিলেমিশে কী অপরূপ নির্মাণ! বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। কাঠ, পাথর, ধাতু, মাটি – সামান্য সব উপাদানে অসামান্য সৃষ্টির নজির আর কোথায় আছে? আমার ঠিক জানা নেই। শুনেছি, আন্দিজের ন্যাজদ্রফ ভ্যালিতে ইনকাদের অমর সৃজনের স্বাক্ষর এখনও অবিকৃত রয়েছে। সে অনেক দুরের পথ। সেই বিস্ময়ের সামনে দাঁড়ানোর বিরল মুহুর্ত কি এ জীবনে আসবে? কিন্তু এই আপনার চেয়ে আপন স্বদেশভূমির প্রস্তরস্বাক্ষরিত প্রার্থনাদূর্গে যে রত্নঘরের দেখা পেলাম তার তুলনা নিশ্চয়ই আর খুজবো না কোথাও। অতি সঙ্কীর্ণ অন্ধকার সিঁড়িপথ পেরিয়ে সামান্য প্রদীপে আলোকিত গর্ভঘরে আসতে সময় লাগে। কিশোর লামা পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। নইলে এমন গোলকধাঁধায় প্রবেশ নিস্ক্রমন বড় কঠিন। ৮০০ বছর আগে পূবের মানুষের হাতে গড়া এই দূর্গের প্রাচীর, থাম, খিলান, রেশমে আঁকা চিত্রপট – কেবল ঘোর লাগে, যা দেখছি ঠিক দেখছি তো?

ঢনকর গুম্ফার অট্টালিকা পাঁচ সাত অংশে উপরে নীচে খানিক দূরে ছড়ানো। এক একটা অংশ দেখে মনে হয়, এই বুঝি খসে যাবে। কিশোর লামা আশ্বস্ত করে, এইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে গোটা বাড়ি, বছরের পর বছর। ঘুরে ঘুরে উঠতে উঠতে আকাশের কাছের চাতালটায় পৌছে যাই। এখানে পাথরের সিংহাসন পাতা। হেলান দিয়ে বসি, দূরের ভূদৃশ্যে চোখ রাখি। দিন ফুরোনো আলোয় সব কিছু মায়াময়। নীচে উত্তরের ফেলে আসা পথপাশে স্পিতি ও পীন নদীর সঙ্গম। পীন মিলেছে স্পিতিতে। মিলনস্থলে স্রোতের জালিকা বিন্যাস, সাথী পাহাড়সারি, উদাসনীল আকাশ – এখানে মৃত্যুর পরেও মরণ আসে না।

সন্ধের পর নরবো লিংএর ঘরে এসে মনে পড়ে ‘ইনার লাইন জয়পতাকার মতো মাথার উপরে তুলে ঘরে ঢোকে।যাক, নিশ্চিন্ত।খুশিতে মন ভরে যায়।অথচ সেই তরুণীর নামটুকু ডায়েরিতে লিখে রাখতে ভুলে যাই।এতদূরে এসেএমন একজন মানুষের নিঃশব্দ বাড়ানো হাত বড়বেশি পাওয়া।সে অফিসের কাগজ হাতে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল যাতে আমাদের কাজে লাগে।ওর কিছু পাওয়ার ছিল না।আমিতো নামটাও নোট করতে ভুলেছি।
রাতে একবার নরবোলিং’ এর ছাদে উঠলাম মাথার উপরের শামিয়ানায় কোটি তারারইন্দ্রজাল।নক্ষত্র পরিবারে এত ঘনবসতি নিজদেশেবসে কল্পনা করাও অসম্ভব।হিমালয়ের কোলে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ালে তার অমোঘ সম্মোহনটেরপাই।এবারযেতেহবে, দৃশ্যের মাঝে হেঁটে দৃশ্যান্তরে।তোমার অভিসারে যাব অগমপারে।সেপ্টেম্বরের দু’তারিখ হয়ে গেল।হাঁটা শুরু হ’লনা।শেষ পর্যন্ত সোয়া এগারোটায় কাজার কাজ চুকিয়ে, নরবোলিং’ এর মায়া কাটিয়ে ছুটলাম কুঞ্জুম-লা হাইওয়ে ধরে উত্তরদিকে।হ্যাঁ, পুরোনো রাস্তায় ফিরতে হ’ল।পীন ও স্পিতি’র সঙ্গম ছাড়িয়ে সেই লোহার পুলটার কাছে এলাম। সেদিন খেয়াল করিনি, এখান থেকেই একটা রাস্তা বেঁকে গেছে উত্তর-পূবে।এই রাস্তার শেষে কিব্বের।কাজা থেকে চব্বিশ কিমি, এর মধ্যে অলটিচ্যূড বেড়ে যায় তিন হাজারফুট।এই রাস্তার শুরুতে বিখ্যাত ‘কীগুম্ফা’ অপেক্ষা করে।তবে সামান্য ডানদিকে (১কিমি) সরে যেতে হয়।এত কাছ দিয়ে যাওয়া, একবারটি দেখে যাবনা? ড্রাইভারঅরাজী।অগত্যা অতিরিক্ত দিয়ে রফা করতেহয়।এখন সোয়া বারোটা।লামাদের আড্ডা ঘরে চায়ের কাপ হাতে বসেছি।অন্ধকার ঘর।অথচ এখানে ওরা লেখাপড়াও করেন।অজস্র দুস্প্রাপ্যপুঁথি, বিচিত্রতৈজসপ্ত্র – এ যেন রত্নঘর।এক হাসিখুশি রসিক লামা আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখালেন, তিনিই আপ্যায়ন করছেন।ভাল বাঙলা বলেন।ভাল গল্প করেন।ওঁর মতে কী গুম্ফার বয়স ঢনকরের চাইতে বেশি।যদিও এনিয়ে ঝগড়াআছে।প্রায় হাজার বছর আগে তৈরী, কিন্তু এখনকার প্রাসাদরূপটি দেখে সে বোঝার উপায় নেই।তুলনায় ঢনকর গুম্ফা চেহারায় চরিত্রে অতিপ্রাচীন।তবে কী গুম্ফায় শিক্ষা, গবেষণা, ধর্মচর্চা – সাড়ম্বরেচলে।এখানে কয়েক’শ আবসিক সন্ন্যাস-শিক্ষার্থীআছে।এরা আসে আশপাশের গ্রাম থেকে।কিব্বের থেকে ও আসে।শুনেছি, প্রতি ঘর থেকে অন্তত একজনকে সন্ন্যাস নিতে হয়।এরাই আগামীদিনের লামা।গুম্ফার অবস্থানটি চমৎকার।নদীখাতের কিনারে দাঁড়ানো একলা পাহাড়ে শিরে এই প্রাসাদ দূর্গ অনেক দূর থেকে দেখা যায়।আর এখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে চেয়ে থাকা – সে অনন্য এক অভিজ্ঞতা।

স্পিতি থেকে লাদাখ ৩য় ভাগ

এবার রাস্তা তড়িঘড়ি উপরে উঠছে।উলটো দিকে থেকে, বলাবাহুল্য, একটা স্রোত নামছে।এ দুমলা নালা,আসছে জাঁসকার গিরিপুঞ্জের এককোন থেকে।গর্জের চেহারা বদলেছে।সে ক্রমশ গভীর, খাড়া পাথরের দেওয়ালে চোখ ধাঁধানো নক্সা চলমান।দুপুর একটা, রাস্তা অর্ধচন্দ্র বাঁক পেরিয়ে সামান্য দক্ষিণে উঠে যেতেই প্রান জুড়োনো ক্যানভাসে জেগে ওঠে কিব্বেরগ্রাম।

গ্রামের আগদুয়ারে একলা আধুনিক সরাইখানা ‘হোটেল তাশিজঙ’।. বেশ সুন্দর সাজানো।রিসেপশানের লাগোয়া ডাইনিং হল আরো কেতাদুরস্ত।টেবিলে টেবিলে ইন্টারনেট সার্ফিং’এর ব্যাবস্থা রয়েছে।সোলার প্যানেলে পাওয়ার সাপ্লাই, একমাত্র ডিশ-এন্টেনায় জোড়া টি-ভি, গোটাতল্লাটের একমাত্র টেলিফোন এই তাশিজঙে মিলবে।হোটেলের গায়ে রাস্তা, রাস্তার পরেই দুমলাগর্জ।গর্জের ওধারে দূরপাহাড়ের কোলে আর একটি গ্রাম, চিচম।দূরত্বের গুনে মনে হয় পুতুলদেরগ্রাম। এখান থেকেই আমাদের পদযাত্রা শুরু ।

chhiam village

মালিক ঝিম্পা দোরজি সজ্জন মানুষ।স্মার্ট,ওয়ার্ম,পোলাইট – সাহায্যের হাত যেন বাড়িয়েই আছে।আমাদের বিশাল লটবহর নিজে তদারক করে দু’ঘরে পাঠিয়ে দিলেন,কিছু মাল বাইরে রাখলেন।তারপর বাইরে রোদ্দুরে আমাদের ডেকে গ্রামের কথা শোনালেন,আমাদের ট্রেক রুট কোনদিকে কেমন গেছে তারও খানিক আভাস দিলেন।কিব্বের শুধু ভারতের নয়,এশিয়ার উচ্চতম গ্রাম।প্রায় সাড়ে চৌদ্দ হাজার ফুট উঁচুতে মানুষের ঘরবাড়ি, খেত খামার, সুখেরজীবন – বুঝলাম ওয়ান্ডার ল্যান্ডে এসেছি। গ্রামে ১০০টি বাড়ি, সবকটির আকারগড়ন একরকম,একই শান্ত সাদা রঙ।হয়ত একজন কারিগরের নক্সায়গড়া। ঝিম্পা দোরজি’র হিসেবে ১০০ বাড়িতে ৫০০ মানুষের বাস।অধিকাংশ যুক্ত চাষের কাজে।কিছু লোক দিনমজুরিতে, কিছু গাইড গিরিতে, আর সামান্য কিছু অংশ সরকারি চাকরিতে যুক্ত রয়েছে।হ্যাঁ,এছাড়া ভেড়া-বখরির কারবারি দু’একজন আছে।শুনেছিলাম কিব্বেরে চাষবাস হয়, সে যে এত বিপূল পরিমানে হয় ভাবতে পারিনি।রকমারি ফসল ফলেনা।কিন্তুবার্লি, কড়াইশুঁটি, আর মিঠে আলু যে মানে ও পরিমানে এখানে হয় তা তাকলাগানোর মতো।

তিনটের পর দূর পাহাড়ের দিকে রওনাদিই।এক্লেমেটাইজড হতে হবে।দু’একজনের ঘরে যাব ভাবলাম, যাওয়া হলনা।চাষের খেতে অনেকের সাথে দেখা হয়ে গেল।সবাইমহিলা, যুবতীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।ক’জন স্পিতি-সুন্দরীর সাথে ভাব জমিয়ে চাদরের বস্তায় মিঠে কড়াইশুঁটি ভরে নিয়েছে।দিতে পেরে ওদের যে কি সুখ, খুশি উপচে পড়েছে।বিশাল বার্লি খেত আকাশের কোন পর্যন্ত গিয়ে থেমেছে।অগুন্তি ফলন্ত শীষ হালকা হাওয়ায় দুলছে।দূর্বোধ্য মৃদু স্বরে যে গান গাইছে তার অর্থ মেঘের মান্দাসে অনুদিতহয়, আমরা বুঝিনা।গ্রাম ছাড়িয়ে পূবদিকে উঠে যাই, যদি আগামী রাস্তাটা দেখতে পাই।প্রায় পাঁচ’শ ফুটউঠে রেখাপথ উত্তরপূবে, পাহাড়শিরে গিয়ে থামে।ঐ শিরে না পৌঁছোলে তেমন কিছু দেখা যাবেনা।তা আমরা তো আচ্ছি শহুরে বরযাত্রীর নতুন গ্রাম দেখার মতো আয়েসি চালে।ক্যামেরাগুলো আর এক বাধা।এরা কেবল থামছে।দিন ও যাইযাই করছে।অতএব, আজ আর শিরে পৌঁছোন হ’লনা।অন্তত হাজার ফুট উঠব ভেবেছিলাম, তাও হ’লনা।অথচ এক্লেমেটাইজেসনের জন্য সেটার খুব দরকার ছিল।যাইহোক, আপাতত যতটা যাওয়া যায়।

স্পিতি থেকে লাদাখ চতুর্থ ভাগ

তাশিজঙে ফিরে আবার ডাইনিং হলে।হাতে চায়ের কাপ, বাইরে সন্ধ্যার আকাশ পাহাড় পুতুল খেলার গ্রাম।দিনের একমাত্র বাসটা এসে থামল।এবার বুঝি আমাদের নেপালি বন্ধুরা আসবে।ঘোড়া আসছে না, পোর্টার আসছে নাএতে সবাই যথেষ্ট টেনসান নিয়ে আছে।না আজ এলো না।কিন্তু সন্ধেটা গোমড়া মুখে কাটিয়ে কী হবে? আকাশ দেখ, এনজয় কর।দিনের আলো নিভেছে, আকাশে কৃষ্ণনীল বিভা।জাঁসকার গিরিপুঞ্জ বিচিত্র অর্ধচন্দ্রে ঘিরে রেখেছে কিব্বেরগ্রাম।দিগন্তে তরঙ্গায়িত গিরিশিরা গাঢ় আঁধারের রেখাচিত্র টেনে দিয়েছে।নক্ষত্রেরা এসেছে একটি দুটি করে।এবার আসছে মহাসমাবেশে।সাঁঝের ক্যানভাসে দূর্গমের নিমন্ত্রন।পর্বতের ওধারে লাদাখ, রূপসুউপত্যকা। ‘কবে যাব? কবে পৌঁছোব?।

তিন তারিখে রসকালটাও কেটে গেল।গাঁয়ের চৌমাথায় ঘুরে এলাম।না, ঘোড়া বা ঘোড়াওয়ালা কারো এখনও পাত্তা নেই।একটু ঘুরে ঘুরে ঘরদোর লোকজন দেখি।প্রতি বাড়ির ছাদে মরা জুনিপারের স্তুপ।সবাই কঠিন দিনের জন্য জ্বালানি জমিয়ে রেখেছে।ক’মাস তুষারের কবলে পড়বে গ্রাম।অক্টোবর থেকেই তুষার বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।তখন কঠিন লড়াই।এদিকে আমাদের লড়াই শুরু হয়ে গেছে।কাল সকালে যাত্রা।আজ এই বেলা সব জিনিস ঠিক ঠাক দেখে মিলিয়ে নিতে হবে।খোলা টেরেসে গনগনে রোদে বসে ফুড-প্যাক গুছিয়ে নিচ্ছে সবাই ।কেউ ঘুরছে ঘোড়াওয়ালার খোঁজে, কেউ বা ক্যামেরায় ফ্রেম করে যাচ্ছে।আমি ডায়েরীতে দু’একলাইন লিখে রাখি।

সূর্য গর্জের ওপারের পাহাড় শির টপকে চলে গেল।চিচমগ্রাম কনে দেখা আলোয় হাসছে।এমন সুন্দর সময়ে মনের অস্থিরতা কাটছেনা।ঘড়িতে ছ’টা।কাজার বাসআসবেএবার।পায়েপায়ে তাশিজঙ ছেড়ে এগিয়ে যাই।রাস্তাটা যেখানে সটান গাঁয়ের কোলে নেমেছে তার পাশে খাদের পানে বেদির মতো একফালি উচ্চতা।ওখানে দাঁড়ালে সামনে পিছনে অনেকদূর পর্যন্ত রাস্তার দৌঁড় দেখা যায়।এই আমার এখনকার ওয়াচ-পয়েন্ট্‌।দূর পিছনের বাঁকে ধুলো উড়ছে।হ্যাঁ, বাসটা আসছে।

রাতে হোটেলঘরে আমরা বড়রা নিজেদের খোশমেজাজে ফিরে পেলাম।চার যুবক নেপালি যোগ দিয়েছে।কোরজোগ গ্রামের পেমা, ওর সঙ্গে ঘোড়া।সে আমাদের নিয়ে যেতে রাজি আছে।সবমিলিয়ে সন্ধের পর খুশির তাপ সবার গায়ে লেগেছে।নেপালিদের মধ্যে তিনজন নেহাৎ ছোকরা – রমেশ, ভরত, প্রকাশ।প্রকাশ রাঁধুনির চাকরি নিয়ে যাচ্ছে ।সে একটু নেতা গোছের।আর একজন তেজিন্দার, তার বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছে মনেহ’ল।জয়েন করার পর ওরা কাজের এটা ওটা বুঝে নিয়েছে।তারপর কিচেনতলা ছোটদের জটলায় সরগরম।ন’টার মধ্যে ডিনারের ডাক।গোবিন্দভোগ, সোনামুগ, ঘি, মসলাপাপড়, ওমলেট – রাতেরথালায়হৈহৈকান্ড!

স্পিতি থেকে লাদাখ পঞ্চম ভাগ

ন’টা নাগাদ জানা গেল , পেমা যাচ্ছে, এবং সস্তায় যাচ্ছে।ঘোড়া পিছু ২৫০ টাকা, পেমা নিজে নেবে ১০০ টাকা।আর কী চাই? তবে সে চাইছে আমরাদু’একটা ঘোড়া বেশি নিই।চার নয়, ছয়।আসলে চৌদ্দটার মধ্যে দশটা ঘোড়া খালি গেলে তার লোকসান।যাই হোক, ওদের বললাম, পাঁচের বেশি নেওয়ার প্রশ্ন নেই।পেমা যেন চটজলদি রেডি হয়ে চলে আসে।আমাদের রওনা দিতে হবে।সাড়ে দশ বেজে গেল।আমাকে দেখে পেমা ঝকমকিয়ে হাসে।সে অদ্ভুত কায়দায় মালবোঝাই করছে ঘোড়ার পিঠে।মাল বোঝাই ও বাটোয়ারা করতে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়।ফ্ল্যাগ অফ্‌’র সময় এল।স্নোলাইনার্স’এর বিশাল সংসার সামনে নিয়ে নীল-সাদা পতাকা উড়িয়ে সবাই দাঁড়ায় ছোট্ট সমাবেশে।শ্রী দোরজি, ওর পড়শী দু’একজন, বিদেশি বন্ধুরা, এবং সদ্য দোস্তি পাতানো নেপালি যুবক এই সমাবেশে যোগ দেয়।সবাই পাতাকা স্পর্শ করে, শুভেচ্ছা জানায়।এর মধ্যে ক্যামেরা ক্লিক করে আজস্রবার, থামতে চায় না।রওনা দেবার আগে আমাদেরও এত সব রিচূয়্যালস্‌ থাকে! শ্রী দোরজির আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে যখন তাশিজঙের বাইরে প্রথম পা রাখলাম, ঘড়িতে বারোটা।কে যেন হঠাৎ চেনা সুরে গান গেয়ে ওঠে, ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয় তো…!’ যাবার বেলায় গানে গানে নিমন্ত্রন! আমার মুখে কথা সরে না, হাতের ইশারায় বলি, ‘দেখা হবে।’অনেক দেরী হ’ল, তবু শুরু হ’ল।প্রথম আধঘন্টা মোটরপথ ধরেই যেতে হয়, ডুমলা নালাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে খেতখামার ছেড়ে যেখানে রাস্তাটা শেষ হয়েছে সেখানে একবার থামি।পিছনে তাশি জঙ, গোটা গ্রাম জুড়ে খেলাঘর যত কত দূরে সরে গেছে।রাজপথ শেষ, এবার খোতে, খচ্চর, ঘোড়াদের পথ সটান নেমেছে ডুমলা গিরিখাতে (গর্জ)।এবং এটাই ট্রেকপথ, আমাদের পথ।মানুষ ঘোড়া একত্রে মিছিল করে নামতে থাকে।রাস্তা সহজ, তবে খানিক পরে বেশ তেজে নীচে যায়, হঠাৎ কেমন সরু ফিতের মতো দুবলা হয়।দু’একবার পা পিছলোয় সবারই।প্রথম দিন, পা জোড়া বশে আসতে সময় নেবে।পেমা বলে, ঘাবড়াও মত্‌।
দেখতে দেখতে প্রায় শ’দুই ফুট নেমে দাঁড়িয়েছি রূপসী নীল নদীর কূলে।কাঠপাথরের পোক্ত সাঁকো পাতা রয়েছে।নদীর এধার যেন হঠাৎ ছড়িয়ে মাঠের আদল নিয়েছে, ওধারে সেই তেজি পাকদন্ডি অপেক্ষায়।এ জায়গাটা ছেড়ে প্রবাহের পরিসর সংকীর্ণ, দুধারে বহুস্তরে বিন্যস্ত পাথরের দেওয়াল খাড়া উঠেছে দুই তিন, কোথাও পাঁচ’শ ফুট।মাঝারি তেজের স্রোত বইছে গভীর গিরিসঙ্কটের মধ্য দিয়ে।দুপুর রোদেও ডুমলা ক্যানিয়্যান ধরে যেতে গা ছমছম করবে।এখানে মিনিট পনেরো খুশির জটলায় কাটে।ডুমলার গর্জন ছাপিয়ে কথা বলতে গলা ফাটে।তবু কথা বলা চাই।খুশির জানান দিতে হবে যে!

উল্টোদিকের চড়াইটা তুলনায় বড় ছিল।এবারের প্রথম চড়াই, একটু বেগ দিল।নামা পরে ওঠা, এ নিয়ম পাহাড়ে প্রায় অলঙ্ঘ্য।উঠে এসে যে পাহাড়শিরে পৌঁছোলাম তা নয়, যেন চলমান পাহাড়ের কোলে ফিরলাম।পিছনে ফেলে আসা গ্রাম আড়ালে চলে গেছে।কিব্বের, তাশি জঙ আর দৃশ্যমান নয়।এই মুহুর্তে রিজ ধরে হাঁটছি, সে সমান্তরালে যাচ্ছে পাশের গিরিপুঞ্জের সাথে।এ নিঃশব্দ মরুপাহাড়ের দেশ।সবুজ নেই, জল নেই, ঝর্ণা নেই, এমনকি বাতাসও থেমে আছে।সামনে পেমার ঘোড়াগুলো অনেক দূরে দুলকি চালে যাচ্ছিল, তারাও হঠাৎ অদৃশ্য।কোথায় লুকোলো আন্দাজ করা কঠিন।যেতে যেতে হদিশ মিলবে – এই নিয়মে গতি বাড়াই।খুব বেশি দূর যাওয়া হ’ল না, থামতে হ’ল দৃশ্যের টানে, দৃশ্যান্তরে।পথপাশে আচমকা জেগেছে শান্তির মরুদ্যান।দক্ষিণ থেকে উত্তরে কুলোর মতো ছড়ানো সমতলে রম্য ফসলের খেত, বুনো ঘাস, চোরা জলাভূমির চোখভোলানো বিন্যাস।জনবসতি নেই, তবে খান তিন চার বামনাকার কুঁড়ে ঘর।চাষবাসের তদারকির কাজে যাদের না থাকলে নয় তাদের বাস।এখন নতুন লোকেরা এসেছে।দূর থেকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি সব।পেমার ঘোড়াগুলো ইতিউতি ছড়িয়ে ঘাস চিবোচ্ছে।পেমা নিজে চিৎ হয়ে আকাশ দেখছে।ওর দেশোয়ালি ভাই, সবাই যাকে আদর করে চায়নাম্যান বলে, সেও ঘাসের গালিচায় ।মিনিট কুড়ি লাগল সবুজ দেশে পৌঁছোতে।প্রথম দিনে এত ধকল ঠিক হবে না।ওকে বলি, ‘সামান উতারো।’ বললাম, ‘চল, টেন্ট লাগাই।’ আকাশে রঙ লেগেছে।আজকের ক্যাম্প ডুমলা।

তাঁবুতে প্রথমদিনের নৈশভোজ, বেশ তারিয়ে সারা হ’ল।এরপর নৈশভ্রমণ অপেক্ষা করছে।রাতের ঠান্ডা কতটা সয় একবার বুঝে নিতে হবে।আকাশ দেখাও হবে।

স্পিতি থেকে লাদাখ ষষ্ঠ ভাগ

ঠিক ছ’টায় বেড-টি নিয়ে এল রমেশ।আশপাশ তখনও ঝাপসা।আকাশে মেঘ।ঠান্ডা জাঁকিয়ে আছে বাইরে।বাতাসে অদ্ভুত শিরশির।কাল রাতে সব গা-সওয়াছিল, এখন স্লিপিং ব্যাগ ছেড়ে নড়তে মন চাইছে না।তবু বেরোতেই হ’ল প্রাতকৃত্যের টানে।রওনা দিলাম পৌনে ন’টায়।পেমারা তখনও ঘোড়া সাজাচ্ছে।মিনিট পনেরোর মধ্যে দুমলা মিডো নীচে পড়ে রইল, তার ভরা সবুজ নিয়ে অপলক চেয়ে থাকল যতক্ষণ দেখা যায় আমাদের,আমরাও দেখলাম বারবার ফিরে ফিরে।কোলের রাস্তা ধরে পাহাড়শিরে উঠতে হবে।উত্তরের পানে টানা চড়াই,তবে খুব তেজি নয়, এখনও নয়।গোমড়া আকাশে হাসির নীল জাগছে ধীরে ধীরে, মেঘ ভাঙছে নানা খন্ডে, দূর প্রান্তে তাদের সাজগোজ চলছে।পাহাড় তেমনই আবরনহীন, নগ্নশরীরে অজস্র চমক।এ সময়টাও বেশ লাগে।কখন অজান্তে পা থেমে যায়, চোখ চলে যায় দূর পাহাড় ছাড়িয়ে আরও অনেক দূরে যেখানে পা-জোড়া পৌঁছোবে না কোনোদিন।

দেড় ঘন্টা হেঁটে একটা ছোট্ট মিডো পেয়ে যাই।মিডো জুড়ে হৃষ্টপুষ্ট জুনিপারের ঘনবসতি। দেখলে মনে হবে এক একটা অশ্বথ কি বটের মিনিবনসাই।সবুজ হলুদ রোদ্দুরে মাখামাখি যেন বিষন্ন মরু দেশে নিঃশব্দ অথচ প্রাণখোলা হাসি।এখানে ওখানে একলাদোকলা পাথর।একটু বসা যাক, ফ্লাস্ক্‌ থেকে চা ঢালা হয়।আড্ডায় মেতেছে সব্বাই ।পেমা, চায়নাম্যান এইমাত্র পাশ দিয়ে হেঁকে চলে গেল।ওদের ভারি ক্যারাভ্যান দ্রুত সামনে উঁচুতে হারিয়ে যায়।পেমা বলে গেল, ‘যাদা রুকো মত্‌।বহুত দূর চলনা হ্যায় রুকো মত্‌।’ হ্যাঁ, আজ গন্তব্য অনেক দূর।আমাদের যেতে হবে পারিলুম্বি নদীর কাছে।পারিলুম্বি শেষপর্যন্ত নিয়ে যাবে পারাঙলা গিরিবর্তে।ঐ নদীর কাছে যেতে হলে এই নদী ছেড়ে যেতে হবে।কিন্তু আমরা এখনও দুমলা রাজ্যে।দুমলা নালা বইছে পশ্চিমে,গর্জের গভীরে লুকিয়ে।পূবের পাহাড়সারি আপনখেয়ালে উত্তরমুখি।এখন মানচিত্র পরিস্কার – এই চলমান পাহাড়সারি ডিঙিয়ে ওধারের গর্জে পা রাখতে হবে, তারপর উত্তরপূবে এগিয়ে পারিলুম্বির কাছে কোনো এক নিভৃতেরসন্ধানে।জায়গাটার নাম থাল্‌ডক।থাল্‌ডক আর এক গহনপুরের আগদুয়ার।আজ সেখানে আমাদের  দ্বিতীয়  তাঁবু পড়বে।দুপুর একটায় পাহাড়শির যেনহাতের কাছে।আকাশের নীলে নগ্ন পাথরের রকমারি বর্শা ফলা কী দূরন্ত নকসা এঁকে যাচ্ছে! রোদ ঝলসানো দুপুরে বিরামের ছায়া নেই কোথাও।মাঝে কখনও একটা দুটো শিলাস্তম্ভ পথের ধারে স্বাগত ভঙ্গীতেদাঁড়ায়।সেখানে একফালি ছায়া,সেখানেই থামি।ফ্লাস্কের চা, ভিউ ফাইন্ডারে চোখ, নোট বইতে দু’চারলাইন।উত্তরশির কিঞ্চিত সৌজন্যবশত ঝুঁকে আসে।সেখানে খন্ডপাথর ও রঙীন জুনিপারের বাগিচা।শুনলাম দুজন লাঞ্চ সেরে এগিয়ে গেছে থালডক ক্যাম্পেরউদ্দেশে।হ্যাঁ, কথা সেরকমই ছিল।পাথরের আসন পাতা রয়েছে,এই বেলা আমাদের ও লাঞ্চ সেরে নিতে হয়।রমেশ কাগজের থালায় রুটি তরকারি এগিয়ে দেয়।এখানে ছায়া নেই বিশেষ গনগনে রোদ সয়ে সাধের থালায় মন দিই।আবারহাঁটতেহবে।এখনও কতপথ কে জানে।

আনতশির থেকে উন্নতশিরে পৌঁছোতে সময় লাগে।এপাহাড় সহজে রাজ ছেড়ে যেতে দেয়না।শির থেকে আবার ভূমিতে সেখানে শেষ নয়, শুরু।অসামান্য নীলের নীচে নির্জন বিপূলা প্রান্তরের বিচিত্র সবুজ ও ধূসরে হাজার পায়ের চিহ্ন ফেলে দিগন্তে হারিয়ে যাওয়ার কবিতা।এখন প্রায় সমতলে নতুন চিন্তার কারণ নেই।বরং দ্রুত এগিয়ে যাই।উত্তরপশ্চিমে মেঘ জমেছে।তাছাড়া ক্যাম্পে কাজের ডাক।প্রান্তর পেরিয়ে এলে নীচের ধাপে আর একটি প্রান্তর অপেক্ষাকরে।তারপর আর একটি।সবশেষে গর্জেরকোলে অসামান্য একটি মিডো।এর নাম থালডক।

ঘড়িতে আড়াইটা।দেখলাম আমাদের তাঁবু খাটানো সারা, পাশে সুইসদেরও তাঁবু পড়েছে।স্যাক নামাতেই গরম স্যূপে টইটম্বুর মগ হাতেচলেআসে।ক্যামেরা নিয়ে একপাক ঘুরে আসতেইকফি।গর্জের ওধারে পারিলুম্বির দেওয়ালটা খোলাচোখে জরীপ করে দেখা।এই মিডো থেকে একটা শিরা সটান ঝাঁপ দিয়েছে গর্জের তলদেশে।সেখান থেকেই উঠেছে পারিলুম্বির অতিপ্রাকৃত প্রাচীর,নজরদারি নেশায় ছুঁয়েছেআকাশ।সে কাউকে দেখছে না।শুধু যেতে নাহি দিব ভাব করে আগলেদাঁড়িয়ে।নগ্নপাথরের গঠনশৈলী অতিজটিল, কল্পনীয়প্রায়।কাল সকালেই ঐগর্জে ঢুকতেহবে।কিন্তু এই দেওয়ালে পা রাখবে কোন পালোয়ান? পেমার ঘোড়াগুলোইবা কী করবে? পেমাহাসে, ওর কোনো টেনসান নেই।বলছে, একদম সুবে নিক্‌নো (নিকাল্‌ পড়ো), রাস্তা আসান আয়েগা।’ মানে খুব সকালে বেরিয়ে পড়লে রাস্তা সহজ হয়ে যাবে।আমি মন্ত্রটা ঠিক বুঝলাম না।এখন ঘড়িতে সাড়ে তিন।আলো ফিরেছেআবার ।এখানে সন্ধের পরেও আলো থাকে,তাঁবুতে ঢুকতে ইচ্ছে হয় না, আকাশে বাতাসে, অচিনদেশেএতসুর এত গান কানে বাজে, এত অনির্বচনীয়ের সুখ চোখে লাগে…।সঞ্চয়ের অনিবার সাধ শত কষ্ট ক্লান্তি বিহ্বলতা ভুলিয়ে দেয়।অনেকে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, সকলে নয়।আজ মোটের ওপর ছ’সাত ঘন্টার শক্ত ট্রেক হয়েছে।তারপর সাড়ে ষোলো হাজার ফুট উঁচুতেক্যাম্প।তাঁবুর ভিতরে যথারীতি আড্ডা বসল,তবে বেশি জমল না।শরীর বিশ্রাম চাইছে।ডিনারও এসে গেল।রমেশ বলছে ওদেরও বিশ্রাম চাই।আমরা খেয়ে নিলে ওরা ছুটি পায়।কাল সকালেই তো লম্বা রাস্তায় ছুটতেহবে।

স্পিতি থেকে লাদাখ সপ্তম ভাগ

দীর্ঘতর রাত।কিন্তু এত উঁচুতে ঘুম সুলভ নয়।তবু মাঝরাতটা বেশ নিঃশব্দে কাটল।ভোররাতে ঘুম ভেঙেও গেল।জিপার খুলে আলোর অপেক্ষা করি, রমেশের উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়ি।বেড-টি চাই।অন্য তাঁবু থেকেও হাঁক শোনা যায়।নির্জন নিঃশব্দ থালডক যেন হঠাৎ জনাকীর্ণ, কর্মমুখরিত।দেখতে দেখতে আকাশ জুড়ে ভূবন ভরা আলো, বাতাসে খুশির খবর।একে একে সবাই তাঁবুর বাইরে, সবাই যেন ছুটির বাঁশি শুনবে বলে বেরিয়ে পড়েছে।কাল যাদের যতকিঞ্চিৎ বিদ্ধস্ত মনে হয়েছিল আজ তারা যথেষ্ট ফূর্তিতে আছে।সামনে পারিলুম্বি গর্জের চ্যালেঞ্জ তাদের বিব্রত করেনি, বরং বেশ উত্তেজিত রেখেছে।বাঁশি বাজলেই মিছিল চলতে শুরু করবে।

এত ভোরে দিনের শুরু, এত সোচ্চার তৎপরতা, এত উত্তেজক অভিযানের ডাক – তবু রওনা দিতে সেই আটটা পার হয়ে গেল।আমাদের গদাইলস্করি আর কাটতে চায় না।আসলে সমতলের কিছু কূ-অভ্যাস পাহাড়ে এসেও ধরে রাখি।কাল বিকেলে অতলমুখি যে শিরাটা আবিস্কার করেছিলাম সেটাই আসলে একমাত্র রাস্তা।রাস্তা বেশ দরাজ, কিন্তু থামতে দেয় না, সে সর্পিল বাঁকে অতি দ্রুত নীচে নিয়ে যায়।যেতে যেতে চোখ ভোলাবার দেদার বন্দোবস্ত – রাস্তার পাশে, বাঁকে, লাগোয়া ঢালে জুনিপারের হৈ হৈ কান্ড।সেখানে সাত রাজ্যের শত রঙ ঝলমলিয়ে হাসে।আর আছে সবুজের বাড়াবাড়ি – এখানে এই মরুপর্বতের দেশে!

প্রায় রাজপথের মতো রাস্তাটা আধঘন্টার মধ্যে ফুরিয়ে যায়, সে ক্রমে সংকীর্ণ সর্পিল চেহারায় পারিলুম্বির পশ্চিম প্রাচীরে জুড়ে গেল।এখন সে আর পরিব্রাজকের পথ নয়, তবে অভিযাত্রীর পছন্দের।ধুলো আর দানাপাথরে পা হড়কে যায় যখন তখন।যেতে যেতে পূর্ব দিক, দূরে উত্তরের বাঁক, তার অনেক নীচে পারিলুম্বির আলুথালু আঁচলের ।এ রাস্তায় এক জোড়া পা আর যথেষ্ট নয়, হাত জোড়াও দরকার।স্টিক চাই, টেকনিক চাই, আর একটু সাহস চাই।এ না থাকলে অভিযানের মজা হারিয়ে যাবে, টেনসান ভুত হয়ে ল্যাঙ মারবে পিছন থেকে।অভিযানের রোমাঞ্চ উবে যাবে, যম-দুয়ারের আতঙ্ক চেপে বসবে।অতএব চল, রাস্তা যত কঠিন হোক সে রাস্তাই, পায়ে হেঁটেই যেতে হবে।অবশ্য বড় ভরসা বোঝাপড়া, একসাথে যেতে যেতে যে বাঁধন তৈরী হয় তা শত আপদেও আগলে রাখে।যার যেখানে কমজোরি সেখানে ভরসার দুটো দশটা হাত এগিয়ে আসে, আসবেই।

এ পাথর সে পাথর করে যেতে হাঁটুতে গোড়ালিতে চোট পড়ে বেশি।তখন পাথরেই সিংহাসন খুঁজে বসে পড়ি।ফ্লাস্কের চা, পকেটের হাইপ্রোটিন বিস্কুট বাদাম।হঠাৎ কত মজার গল্প এসে যায়।অনেক বছর আগে যে বন্ধুরা হাঁটত তাদের ঝুলিতে রাজ্যের রসদ থাকত।এখন দেখছি এদের ঝুলিতেও মৌতাতের দেদার ব্যবস্থা।অবশ্য বসে থাকা খুব স্থায়ী হয় না, মিনিট পনেরো বিশ গেলে অস্থিরতা শুরু হয়।হাতের ক্যামেরা অলস পড়ে থাকতে চায়, আমরা আর কেমন করে বসে থাকি।তাছাড়া অনেক পথ বাকি।আবার পাথর ভেঙে পড়ি মরি নীচে নামা শুরু হয়।নামতে নামতে উৎপল দত্তের সংলাপ মনে পড়ে, ‘এ থ্রিলিং নয়, রীতিমত কিলিং!’ মাঝে আরও দু’দফা বিশ্রাম বৈঠক সেরে এগারোটা নাগাদ নেমে আসি আকাশকাঁপানো পারিলুম্বির কাছে।এর মধ্যে প্রায় হাজার ফুট নেমেছি।নদীর গর্জনে বুকেও কাঁপন প্রবল গর্জনের গভীরে গানের ভাষা শুনি।কিন্তু সব কেমন দূর্বোধ্য, বুঝলাম কান তৈরী হয়নি এখনও।

সামনে উড়ালপথ সোজা উত্তর আকাশকে ছুঁয়ে ফেলেছে মনে হ’ল।না, বড় চড়াই এর মহড়া নেবার আগে থামা দরকার।এবার লাঞ্চ ব্রেক।উগ্র স্রোত আর কিম্ভূত পাথরের উন্মাদ নাচন দেখতে দেখতে রমেশের দেওয়া রুটি-সব্জির সদব্যবহার করি।আজকের লাঞ্চপ্যাকে কিছু অতিরিক্ত বরাদ্দ রয়েছে।কোথাকার মানুষ কোন দূর নির্জনে বিচিত্র ভূদৃশ্যের মাঝখানে মধ্যাহ্নভোজের আসরে মিলেছি।এ এক অনন্য অনুভুতি।কথায় এই সুখের প্রকাশ সম্ভব নয়।

দিবাকার এখন মাথার ঠিক উপরে, আর দক্ষিণ থেকে উত্তরে ছড়ানো আয়তাকার আকাশের গাঢ়তর নীল।কোথাও একটুকরো সবুজ নেই, কোনো পাখির উড়ে যাওয়া নেই, নদী ছাড়া প্রাণের কোনো প্রবাহ নেই।তবু নির্মমতায় যে এমন অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের আয়োজন থাকে তা সমতলে বসে ধারনাতেও আসবে না।যেতে যেতে চড়াই ক্রমশ তেজি হয়ে পড়েছে, দমে টান পড়ছে ঘন ঘন।তাই থামতেও হচ্ছে সেইমতো।জাঁস্‌কার গিরিপুঞ্জের কোন গহনে চলে এসেছি, সামনে কোথাও নিস্ক্রমনের পথ আছে, চোখ তার খোঁজ করে যাচ্ছে।এর মধ্যে তো প্রায় দেড় হাজার ফুট উঠে এলাম, কোথায় সেই গিরিপথ? যার নাম পারাঙ-লা?

পারিলুম্বি হঠাৎ উত্তর-পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে, বা বলা ভাল যে দুই গিরিখাত দুদিক থেকে এসে আমাদের সামনে মিলে গেছে।আর যেখানটায় মিলেছে ঠিক সেখানেই দিনের শেষ চড়াইটা অপেক্ষা করে আছে।আবার হাজার ফুটের মহড়া।তারপর রাস্তা যেমন এগিয়েছে সেখানে আর নদী নেই, নদী বাঁদিকের গর্জে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।অর্থাৎ এবার পারিলুম্বিকে বিদায় জানাতে হবে।আমার ম্যাপে তেমন সঠিক নির্দেশ নেই, চোখ যা দেখছে তাতে ওই প্রাচীর লক্ষ্য করে যাওয়াই ভাল।দিনের শেষে দিন মেজাজ হারাল।তখন বিকেল, হঠাৎ আলো নিভে যায়।বর্ষণের পূর্বাভাস স্পষ্ট।সাড়ে ষোলো হাজার ফুট উঁচুতে জল ঝরবে না, ঝরবে তুষার।সেটা ভারি হলে পরস্থিতি ঘুরে যাবে।এই বেলা জোর কদমে যেতে হবে।তখনই ঝড়ের প্রথম ঝাপটা গায়ে লাগল।বর্ষণ শুরু হ’ল।বৃষ্টি নয়, তুষারপাত।ঘন তুষারদানা হুলের মতো বিঁধছে চোখে মুখে।দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল, পা জোড়া হারাল ছন্দ গতি।সামনের চড়াই বিপজ্জনক, অগম্য।এ অবস্থায় যাওয়া নিষেধ।কোথাও থামতে পারলে, না, এখানে আশ্রয় স্বপ্নেও মিলবে না।তাই যেতে হবে।হিমেল হাওয়ায় শরীর কাঁপছে, পোশাক তছনছ, খুব দরকারি জিনিসগুলোকেও বাঁচাতে পারছি না।এমন বেহাল অবস্থায়ও পা-জোড়া হাল ছাড়ে না, ওরা সাহসী মানুষকে সঙ্গ দেয়।আর সময় ভীরু হাবাগোবা কেও ডাকাবুকো করে দেয়, আমাকেও বেশ উসকে দিল।দেখতে পাচ্ছি শ’দুই ফুট উপরে, শিরের প্রায় কাছে ইস্পাতধুসর আকাশের গায়ে অভিযাত্রীছায়া চলমান।সেই ছায়ামূর্তি একবার পিছনে ফিরে দেখল।আমি ইশারায় জিজ্ঞেস করতে চাই – ওধারে ক্যাম্প দেখতে পাচ্ছো? খানিক পরে সে ইশারা বুঝতে পারে, শূন্যে হাতের নক্সা কেটে বোঝাল – আরও কিছুটা না উঠলে কোনো রিপোর্ট সম্ভব নয়।কেন জানিনা আমার মেজাজ চড়ে গেল।ও বোধহয় কিছু মিস করে যাচ্ছে, বা আর্জেন্সি বুঝতে পারছে না।ও এই মুহুর্তে যেখানে দাঁড়িয়ে ওখান থেকে ক্লিয়ার ডিসেন্ডিং ট্রেল দেখতে পাবে।এবার অবুঝের মতো এলোপাথারি উঠতে শুরু করি, এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দম হারিয়ে ফেলি।দুব্‌লা শরীর কুঁকড়ে যায়, বুকে হাতুড়ি পিটছে কেউ।একবার মাথা তুলে দূরের শিরটাকে দেখি।সে পৌঁছে গেছে, এদিক ওদিক দেখছে, কোনো হেলদোল নেই।ওকে যে ইশারায় কিছু বলব সে শক্তিও গেছে।

ধাতস্ত হতে সময় লাগল।এর মধ্যে আকাশ তার অকারণ আক্রোশ ত্যাগ করেছে।ঝড় থেমেছে, মেঘে চিড় ধরেছে, সামান্য আলো ছিটকে এসে পথে পড়েছে।আবার উঠতে থাকি।আবার তাকে দেখিসে শির থেকে বাম দিকে ঘুরেছে।কেন? শেষবেলায় উত্তর ভুলে পশ্চিমে কেন? সামনে গিরিবর্তের দেওয়াল হাজার অভিযান সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ হয়ে দাড়িয়ে আছে, তার নীচে মাঝের বিশাল বন্ধুর তেপান্তরে তাঁবু ফেলার জায়গা ছিল না? তাহলে কি এখানে আদৌ কোনো ক্যাম্পসাইট নেই? …আমি নিজে যখন উড়ালপথের শিরে পৌঁছোলাম, বুঝলাম শির নিজেই বেঁকে গেছে বায়ে; রাস্তা গেছে তার সাথে।নীচের বিশাল নৈরাজ্যের মহাদেশে একফালি সমতল জেগে নেই।জল বা ঝর্ণার নিশানা নেই।অতএব এখানে ক্যাম্প নয়।তার মানে সামনের দেওয়ালে পারাঙ-লা নেই।তার মানে ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।’

অগত্যা বিপুলা গর্জের মধ্যবর্তী শির ধরে পশ্চিমে এগোতে থাকি।কিন্তু পশ্চিমেও, যতদূর চোখ যায়, ক্যাম্পসাইটের আভাস নেই।এই রিজটা (শিরাপথ) এক কিমি দূরে প্রায় ১০০ মিটার উপরে দ্বীপের মতো একটা মিডোকে ছুঁয়েছে।ওখানে সব কিছু যেন আবার বাঁক নিয়েছে উত্তরে বা উত্তরপূবে।সন্ধ্যা নামছে, আঁধার একরকম স্থায়ী হয়ে আসছে।আর কতদূরে নিয়ে যাবে পথ? পারাঙ-লা গিরিপথের বেস-ক্যাম্প বোরোজেন – ম্যাপে যেমন হদিশ ছিল তা মিলছে না।এ পথের পুরোনো বন্ধুরা বলেছিল, ‘পাস ইটসেল্‌ফ একটা পাজ্‌ল,’ ‘বেস-ক্যাম্প্‌ রিলেটিভলি ইজি।’ অবশ্য হাই-অল্টিচ্যূড ট্রেকে পাজ্‌ল কিছু থাকবেই, যারা যায় তারা পাজ্‌ল খানিক পছন্দও করে।আমি নিজে এ কথা নানাভাবে বলি, বলেছি।এখন নিজেই মানতে পারছি না।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্যাম্প কতদূরে?’ ‘নজ্‌ডিক, লেকিন ঠোরা ডূর যানা হ্যায়।ইস্পাতধুসর আকাশে গাঢ় রেখায় পর্বতের শির জেগে আছে তীব্র অথচ স্থির তরঙ্গে।পায়ে পায়ে উত্তরের বাঁকে উঠে আসতে আসতে বুঝি, এটাই জাঁসকার গিরিপুঞ্জের প্রান্তিক শিরা।এবং আমি ঐ শিরের খুব কাছে।উত্তরের উড়াল একটা গালিতে গিয়ে যেন মিলছে, সেই গালিটা নিশ্চয়ই এধারের শেষ অন্দরমহলে নিয়ে যাবে যেখানে বোরোজেন নামের এক চোরকুটুরি আছে, অনেক যুগ ধরে আছে।যেখানে আমাদের লাল নীল গোলাপি তাঁবুগুলো পড়েছে।হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ক্যাম্প দূরে নয়।

রাত ন’টা নাগাদ বড় তাঁবুতে থিতু হওয়া গেল।বাইরে হাঁটাচলা দূরের কথা, নড়াচড়াও সম্ভব নয়।জায়গাটা খুব গোলমেলে।অবশ্য এর চাইতে খারাপ জায়গায় ক্যাম্প করার অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে।সে তুলনায় এ জায়গাটা কম বিপজ্জনক।তবু আমরা যেন এর জন্য ঠিক তৈরী ছিলাম না।শিরের দেওয়াল ঘেঁষে মুখোমুখি দুটো তাঁবু পড়েছে।নীচের ধাপে কিচেন আর রমেশদের তাঁবু।আরও নীচে বড় সাদা ছাতাটা যেন দেখলাম, ওটা পেমার তাঁবু।কোথাও সরাসরি যাওয়া আসা সম্ভব নয়, যেখানেই যাই অনেকটা ঘুরে যেতে হবে।

স্পিতি থেকে লাদাখ অষ্টম ও শেষ ভাগ 

মোটামুটি চারটে পর্যন্ত ভরপুর মজা দিয়ে গেল।এর পর আর শুয়ে থাকা গেল না।বোরোজেন এখনও অন্ধকারে  সবাই  ঘুমোচ্ছে, এটা ভাল লক্ষণ।চা’এর অপেক্ষায় থাকি। ছ’টা নাগাদ কিচেনে ঠুংঠাং, ঘর্‌ঘর্‌ শুরু হ’ল।স্টোভ জ্বলছে, তেজিন্দারের গলা ।

আমাদের ম্যাপ বলছে পাসের ওধারে প্রথম যে ক্যাম্প সেটা ১৬,০০০ ফুটের কাছাকাছি।তাহলে মাঝে একমাত্র সাড়ে আঠেরো হাজার ফুটের পাস পারাঙ-লা।একবার পেরিয়ে গেলে ‘খর্‌সা-ইয়োংমা’, লাদাখের প্রথম শিবির। দেখলাম এটাই  আদর্শ ক্যাম্পসাইট।প্রায় সমতল দেড়/দু’শ বর্গফুট জায়গা, পাশের দেওয়ালে শীর্ণ শীতল ঝর্ণা।এইটিই জলের একমাত্র উৎস।ভরত ঐ সামান্য ধারা থেকে নীল ড্রাম ভরে জল নিতে এসেছে, কি কসরতটাই না সে করছে।সামনের ভূদৃশ্যে চোখ রাখি।জাঁসকারের প্রান্ত-প্রাচীরে সূর্য ছুঁয়েছে।গাঢ় আকাশে রত্নখচিত শরীর নিয়ে হেলান দিয়েছে পারাঙ-লা দুর্গ।তার বুকে, জানুদেশে, উন্নত গ্রীবায় মহাজাগতিক ভাস্কর্যের নিদর্শন যত ছড়িয়ে রয়েছে।পূবে পশ্চিমে যতদূর চোখ যায় সবখানে সেই ঘোরলাগানো কারুকাজ।দক্ষিণের ঈষৎ অন্ধকারে অতল পৃথিবীর আহ্বান।সেই কোন গভীর থেকে আমরা এসেছিলাম! কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালাবো বলে এই সুদূরে পৌঁছোতে চেয়েছি।এক অনুপম নির্মম অর্ধবৃত্ত আমাদের ঘিরে আছে।বৃত্তের উত্তরমুখি জ্যা’এর মাঝখানে ঠিক V-এর মতো সুন্দর অবনতি।ঐ তো পারাঙ-লার তোরণ।

আমারহিসেবে রওনা হবার কথা।পৌনে ছ’টায় ভরত চা নিয়ে এল।তখনও পেমার হাঁক ডাক নেই।বাইরে তীব্র হিম, মৃদু হাওয়া।দক্ষিণের দিগন্তে ও অতলে চোখ চলে যায়।সেখানে উজ্জ্বল অন্ধকার।জাঁসকারের সীমান্ত শীর্ষে সূর্যের চোখ ঝলসে উঠেছে।পূব দেওয়ালের দানব ছায়া বোরোজেন শিবিরকে লুকিয়ে রেখেছে।বড় দিন কি এমনি করে আসে? এত শান্ত, এত শীতল, এত রহস্যময়! ভিতরে ঢুকে আবার আয়েশ করে বসি।বাইরে কাঁসরতীক্ষ্ণ ডাক, ‘লিটডার সাব -’ সর্বনাশ, পেমা এসেছে।ছ’টা বেজে গেছে, আর আমরা তাঁবুতে বসে আয়েশ করছি।পেমা রীতিমত তর্জনগর্জন শুরু করে দিল।সে একরকম ভবিষ্যদবানী করে বসে, ‘আজ আপলোগ গেলেসার (গ্লেসিয়ার) মে ফাঁস যাওগে।আব আপনকো মারোগে তো কোন বাঁচায়েগা?’ ফরমান জারি করে, ‘আভি নিক্‌নো।’ আভি মানে? আমরা তো পা বাড়িয়েই আছি।নিজেদের স্যাকগুলো একরকম গোছানো হয়েই ছিল।তাঁবু গুটোনো বাকি।রাতে সামান্য বরফ পড়েছে।আউটার ফ্লাইগুলোয় হালকা চাদর জমেছে।এ অবস্থায় কাজটা শক্ত।সামরিক তৎপরতায় ভারি সাজগোজ সারা হয়ে গেল।সেই ছোট্ট পরিচিত ইশারায় হাত তুলি, অভিযাত্রী মিছিল চলতে শুরু করে।দুবলা ঝর্ণার কাছে এসে জলের বোতলগুলো ভরে নিই।তারপর নূড়ি বোল্ডারের নৈরাজ্যময় ঢেউ ভেঙে মিছিল বাঁক নিল উত্তর-পূবে।

পূব দেওয়ালের রাস্তাটা ডাকছিল, পায়ে পায়ে সাড়াও দিলাম।এ রাস্তা সুন্দর শান্ত সহজ, প্রথম পর্বে তিরিশ ডিগ্রির বেশি চড়াই নয়।হাঁটুতে তেমন চোট পড়ে না, তবে দমে সামান্য টান পড়ে।আজ বড় দিন।এই দিনের একটা তাড়া আছে।কিন্তু এই পর্বে তাড়াহুড়ো করা যাবে না।তেমন বেদম হয়ে পড়লে বড় দিনের মহড়া নেওয়া অসম্ভব। সামনে কোনো ভীষ্ম মহারথী নেই, আছে পারাঙ-লা’র শীর্ষ তোরণ।কিন্তু আমার ‘পরে গোটা দলের গতি নির্ভর করছে।তাই চলা ও থামায় যথেষ্ট ব্যালেন্স রাখতে হচ্ছে।

দেখতে দেখতে সেই ‘Great Circular Basin’এর প্রান্তিক রাজ্যে চলে এসেছি।পশ্চিমে আলতো বাঁক নিয়ে মিনি উৎরাই পথে ছোট্ট আইসফিল্ডে পা রাখি।পায়ের পোক্ত স্টাডের তলায় শুভ্রকঠিন বরফ শান্ত আচরন করে।দ্রুত বেসিন পার হয়ে তিরিশ ডিগ্রি কোনে আবার দুর্গপ্রাচীরে ফিরি।এই তো জাঁস্‌কার দুর্গের শেষ প্রাচীর।ভাস্কর্যপরিকীর্ণ ধুসর, গৈরিক কৃষ্ণধুসর, যুগল মিনারের মাঝখানে দীর্ঘ গভীর ক্ষতচিহ্নের মতো সেই আরোহী পরিখা (গালি)।তাকেই নিশানা করে উঠেছে সর্পিল পাকদন্ডি  আলগা পাথর, স্ক্রি-জোন, বা ক্রিভাসের সন্ত্রাস কিছু নেই।শৈলপ্রাচীরে একাধিক প্রশস্ত পথরেখা আপন খেয়ালে দ্রুত লয়ে পারাঙ-লা শীর্ষে উঠে গেছে। So, the last climb waits…।আজ আকাশ বাতাস মেঘ-রোদ্দুর সব অনুকুল।এর আগে কত গিরিপথে দুঃসাহস দেখিয়েছি, কিন্তু এমন বিনয়ী আবহে, এমন নিঃশঙ্ক আরোহনের অবকাশ ক্কচিৎ জুটেছে।ন’টা বেজেছে।প্রথম দু-চার পা উঠে বুঝলাম সহজ পায়েই যাওয়া যাবে।বেশ চ্যালেঞ্জিং ক্লাইম্ব্‌।কিন্তু এখানে বাড়ানো হাতের প্রয়োজন নেই, টেকনিক্যাল সাপোর্ট্‌ চাই না, অ্যাক্স্‌ বা রোপের দরকারও নেই।শুধু দমে মারাত্মক টান পড়ে।আঠেরো হাজার ফুট ছাড়িয়ে উঠতে গেলে এটা স্বাভাবিক, অন্তত এই সব দুবলা লোকেদের ক্ষেত্রে।বিশ পঁচিশ পা উঠে থামি, মিনিট দুই তিন থামি, আবার উঠতে থাকি।মাঝে মাঝে পিছনেও ফিরি, নিঃশব্দ জাঁস্‌কারে দূরাগত পেমার তিরিখ্যি কাঁসুরে হাঁক বিচিত্র সুখের মন্ত্র হয়ে কানে বাজে।আর মনে মনে বলছি, ‘আজ খুশিতে মন ভরে উঠেছে, পারাঙ-লা, তোমার দুয়ার খোলো।’ কতটা চড়াই ভাঙলে পরে অভিযাত্রী বলা যায় জানি না, কিন্তু আমাদের তো.. We must enjoy the trail… এই পথ চাওয়াতেই এ আনন্দটুকু আছে তাকে মাটি করে কোন আহাম্মক ?

নাতিদূর অতীতে স্পিতি, পিন, বা জাঁস্‌কার অঞ্চল থেকে লাদাখের পারে-ছু, রূপসু, এমনকি তিব্বতে যাওয়ার অন্যতম প্রধান গিরিপথ ছিল পারাঙ-লা।এবং এটি ছিল অন্যতম প্রাচীন বানিজ্যপথ।কিন্তু এটি ট্রেকারদের কাছে একরকম অচেনা অজানাই ছিল।সেদিনের দূর্গমতার বড় কারণ ছিল প্রপার সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব।অভিজ্ঞ গাইড, পেশাদার ঘোড়াওয়ালা বা কুলীদের পাওয়া যেতো না।নামী ট্রেকদলও ঐ দিকে যাওয়ার সাহস করত না।তাছাড়া আকাশের অনিশ্চয়তাও একটা বড় কারণ ছিল।তার মানে এই নয় যে আজ দু’দশক পরে হঠাৎ জাঁস্‌কারের আবহাওয়া অতিউদার হয়ে পড়েছে।আসলে পরে অনেক সাহসী অভিযাত্রীদলের অনুসারী যাওয়া আসার সুবাদে আজ আকাশের নানা সময়ের গতিপ্রকৃতি জানা বোঝা হয়েছে।তাই আজ পারাঙ-লা’র দিকে যাওয়ার দিনক্ষণ স্থির করা সহজ।আজ ভরসা করার মতো সাপোর্ট সিস্টেমও আছে।লে শহর থেকে সরাসরি রূপসু যাবার সুন্দর সড়কপথও আছে।তাই সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেকরুটের দিক বদলেছে।ইদানীং ট্রেকাররা, বিশেষত বিদেশীরা, উল্টোদিক থেকে পারাঙ-লা পেরিয়ে স্পিতি বা পিন উপত্যকায় পৌছে যাচ্ছে।না, আর তো ওঠার মতো জায়গা নেই।এই পৃথিবীর শিরে উঠে এসেছি।সামনে বিপূল শুভ্রতার মহাদেশ।তারপর কি এক অনিবার্যতায় পরস্পরের বুকে বাঁধা পড়ে রইলাম অনন্তকাল।অবশেষে আমরা পারাঙ-লা শীর্ষে।ঘড়িতে ঠিক পৌনে দশটা।

জাঁসকারের প্রান্তিক শিরে দাঁড়িয়ে চোখ মেলে দিলাম উত্তরে পূবে পশ্চিমে।সামনে অসীমে বিস্তৃত ভিনগ্রহসদৃশ ভূদৃশ্যে এক অচেনা ভারতের ক্যানভাস।এ দৃশ্যে রয়েছে শান্ত সম্মোহন।বহুযুগের বিভাজিকা শিরা সামনে ও পিছনে অতিদূর বিস্তৃত।একদিকে বরফের বিশেষ ছিঁটেফোঁটা নেই, অন্যদিকে দিগন্তবিস্তারি শুভ্রতার মহাদেশ যার মাঝ দিয়ে জাঁস্কারের নানা উপশিরা আকাশ ও দিগন্তকে হার মানিয়ে কোন আজানায় উধাও হয়ে যেতে চায়।আমাদের বামে স্পিতি, ডাইনে লাদাখ।সহসাস্তিমিত আলোয় নন্দিত উত্তরের আপাতসীমাহীন বরফের ময়দান অভিযাত্রীদের যুগ যুগ ধরে ডেকেছে, আজও ডাকছে।কিন্তু ঐ ময়দানে পা রাখতে গেলে শির থেকে তীব্র পতনের বিপজ্জনক উৎরাই সামাল দিতে হবে।দিতে তো হবেই, কেননা এই অবরোহী শুভ্র উড়ালপথেই পারে-ছু নদীর প্রবাহে পৌঁছোনো যায়, ভিন্ন পথ নেই, শর্টকাট নেই।আসলে এই বিপূলা তুষারক্ষেত্রের নীচে প্রবাহিত পারে-ছু হিমবাহ, এর শেষে জন্ম নিয়েছে সেই নদী যার অনুসারী সঙ্গ আমাদের পৌঁছে দেবে সুন্দরী রূপসু’র কাছে।আমরা সবাই পাগলের মতো ছবি তুলে যাচ্ছি । আমার ঘড়িতে এখন সোয়া দশ।গিরিবর্ত বিজয়ের অনপূর্ব গৌরবে পতাকা ওড়ায়।শীর্ষসমাবেশ স্থায়ী হ’ল প্রায় এক ঘন্টা।এই দৃশ্য, এই দৃশ্যান্তর, এই সময় – সবকিছুকে ধরে রাখার জন্য এক ডজন প্রায় ক্যামেরার পাগলামি চলে।সে পাগলামির শরিক আমিও।এগারোটার পর লাদাখ ভূখন্ডে পা রাখলাম।শীর্ষ-শিরা থেকে আচমকা নেমেছে বরফের ঢাল।আমিও দেখলাম বরফের ঢালে বেশ কটি সুন্দর গালি-পথ রয়েছে, সেগুলো নিরাপদ, ফুটহোল্ড আছে।

যা আন্দাজ করেছিলাম তার চেয়ে দ্রুত নেমে এলাম।তুষারক্ষেত্র ছায়াচ্ছন্ন, তাই উপরিতলের বরফ গলেনি বিশেষ।প্রায় তিন’শ ফুটের গালিতে পা রাখার খাঁজ খোঁজ মিলেছে ঠিক।মাঝে কখনও স্টাম্পিং করতে হয়েছে।৬০ – ৭০ ডিগ্রী ঢাল পেরিয়ে এসে বরফের ময়দানে এসে পড়েছি, সে ময়দান ২০ – ৩০ ডিগ্রী কোনে বহুদূরে আনত।আমরা যাচ্ছি, সঙ্গে ডাইনে বাঁয়ে চলেছে দুটি গিরিশিরা।জাঁস্‌কারের বিভাজিকা শির থেকে ওরা নেমেছে, পরস্পরকে অনেকে দূরে রেখে অভিসারি রেখায় এই তুষারক্ষেত্রকে আগলে নিয়ে চলেছে।গোটা ব্যাপারটা এক বিশাল শ্বেতপাথরের কুলোর মতো, যেন অঞ্জলি হয়ে পারে-ছু’র প্রবাহে ঝরে যাবে বলে আনত হয়েছে।পশ্চিম শিরার ওপারে টুকরো মেঘের ফাঁকে মাতা শৃঙ্গের আভাস।উত্তরে পৃথিবীটা যেন গেরুয়া ধুসর পর্বতপ্রাচীরে শেষ হয়ে গেছে।তার ওধারে আর কোনো পৃথিবী নেই।আমরা পূব-দেওয়ালের কোল ঘেঁষে যাচ্ছি, কেননা আইসফিল্ডের মাঝখানে অজস্র ক্রিভাস।এই বিপুলা শুভ্রতার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক আশ্চর্য সুখের গল্প।সুন্দর তার পসরা সাজিয়ে রেখেছে সবখানে।রোদের দিনে প্রাণ পাওয়া স্রোতের জালিকায় স্বল্পগভীর যত খাত ছড়িয়ে আছে পথিমধ্যে, ছড়িয়ে আছে তেজি হাওয়ার আঁচড় পাশের দেওয়াল জুড়ে, আর আছে খেয়ালি তুষারপাতে গড়া বিচিত্র ভাস্কর্য যত।এমন সৌন্দর্য পরিকীর্ণ ভূদৃশ্যের মধ্যে দিয়ে নীরবে হেঁটে যাওয়া, যেতে যেতে দৃশ্যান্তরের স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা – সব মিলিয়ে জীবনের অনন্য কিছু মুহুর্ত।এক জীবনের মাঝখানে যেন অন্য এক জীবনের সঞ্চয়।হোয়াইট-আউট।আর এর মধ্যে রাস্তার দিশা পাওয়া কঠিন।একবার মনে হ’ল রাস্তাটা একইভাবে ডান বরাবর গেছে।পরক্ষণেই মনে হ’ল, ম্যাপে অন্যরকম ছিল।আইসফিল্ডের টার্মিনাল রিজিয়নে এসে সেটাকে কোনাকুনি ট্র্যাভার্স অত বিশাল আইসফিল্ড স্নাউট এরিয়ায় এসে গুটিয়ে কিম্ভুত সরীসৃপের চেহারা নিয়েছে।লাস্টল্যাপে গ্র্যাডিয়েন্ট বেশ শার্প।এখানে বরফগলা জলের তোড়ও বেড়েছে।শেষের দশ মিনিটে আর একটা টাফ্‌ টেস্ট দিতে হ’ল।বরফ ছেড়ে পাথরে আসি।পাথরে পাথরে পা রেখে সদ্যোজাত নদীর কাছে, পারে-ছু’র প্রথম প্রবাহে।লাদাখের মাটিতে বসেছি লাঞ্চ সেরে নিতে।রুটি আর আলুছোলার মশলাদার চাট দিয়ে প্যাক্‌ড লাঞ্চ সারা হ’ল।

যেতে যেতে পথরেখা আচমকা নীচে নামে, সে হারিয়ে যায় পারে-ছু বেসিনে, রঙীন নুড়িপাথরের গালিচায়।এখানে এসে আবার দ্বন্দ্বে পড়ি, নীচে যাব, না যেমন যাচ্ছিলাম তেমনিই যাব? পেমারা এখনও বেশ পিছনে।স্যাক থেকে ম্যাপটা আর একবার বার করে দেখি।ক্যাম্পসাইট ওপারে, তার মানে নদী পার হতেই হচ্ছে।তাহলে পারে-ছু বেসিনে নামলে ক্ষতি কী?  পারে-ছু বেসিন প্রথম দেখায় চোখ ভুলিয়ে দেয়।অযুত রত্নময় নুড়ি ছড়িয়ে আছে উধাও প্রান্তরে।ক্ষণে ক্ষণে দৃষ্টি থেমে যায়।পারে-ছু বয়ে যাচ্ছে এখান থেকে অন্তত এক কিমি দূর দিয়ে।তার ঝলসানো রূপোলী রেখা ডাকছে।ধ্যানগম্ভীর পর্বতেরা ‘কতদূরে যাবে পান্থ?’ জিজ্ঞাসা নিয়েঘিরে আছে আমাদের।ভাবখানা এই – আজ তোমাদের দৌড় বেশি দূরে নয়।আমরা তবু যাচ্ছি।যাচ্ছি পারে-ছু’র প্রবাহ লক্ষ্য পার করাবে কে? পাচঁ সাতটা সহচরী স্রোতের জালিকা কোনোমতে পার হয়ে গেলাম।এবার সামনে পূর্ণযৌবনা পারে-ছু’র মূল প্রবাহ।তার শরীরের তাৎক্ষণিক প্রচন্ডতায় বুকে কাঁপন লাগে।দিনের শেষে পাহাড়ি নদী চির-আতঙ্কের কারণ।গনগনে দিনে জল অতিরিক্ত বেড়েছে ।পাঁচ থেকে দশ ডিগ্রি ঢালে যে নদী বইছে, সে গাঢ় গভীর তানে দশদিক মন্দ্রিত করে যাচ্ছে তার যাত্রাপথে।এই দূরন্ত প্রবাহ পার হব কী ভাবে? হাতের কাছে দড়িদড়া কিছু নেই এই মুহুর্তে।তেজিন্দার সে আমাদের জুতো প্যান্টালুন সব খুলে ফেলতে বলে।সবাই জুতো, মোজা, ট্র্যাক স্যূটের লোয়ার – সব একে একে খুলে নিই, পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করি।স্রোতের উলটো দিকে কুশলী পায়ে কোনাকুনি লড়ে যেতে থাকে।বেশ ভারি যুদ্ধ এপারে এসেই চটজলদি জল মুছে নিয়ে সে সেল্‌ফ ম্যাসেজ শুরু করে।বুঝলাম এই মুহুর্তে তার পায়ে সাড় নেই।এক বিপজ্জনক খেলা।দুই জোড়া মানুষ তোড়ের মুখে বেসামাল, ব্যালান্স রাখতে প্রাণ বাজি রাখার দশা।কিন্তু সব খেলার একটা নিজস্ব ছন্দ থাকে, সেটা একবার বুঝে নিলে খেলাটা শেষ পর্যন্ত সহজ হয়ে যায়।

এখন ভূগোলটা বেশ স্পষ্ট।পশ্চিম থেকে একটা স্রোত ছুটে এসে পারে-ছু’তে মিলেছে।সে আসছে গম্বুজের ডানদিক দিয়ে, আর পারে-ছু নিজে চলেছে গম্বুজের বাঁদিকে, অর্থাৎ পূবে।এই বহুদূর বিস্তৃত বাঁকে এখানে ওখানে কিছু বিক্ষিপ্ত সবুজের আভাস দেখা যাচ্ছে।অধিকাংশ জুনিপার।বাঁকের কিছু আগে আমাদের পথপাশে একফালি সাজানো সমতল দেখা গেল।ওখানে পাথরের ক’টা ছোটখাট দেওয়াল রয়েছে।পাথরের কুন্ডে পোড়া কিছু, ছাই ইত্যাদিও দেখা গেল।এ মানুষের হাতের কাজ।ম্যাপের হিসেবে এর নাম খরসা-ইয়োংমা।এটিই ক্যাম্পসাইট।

নিশ্চিত গন্তব্য দিনশেষে কেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।পা শ্লথ হয়ে আসে, দৃষ্টিও যেন ঝাপসা…।বোতলের জল, ফ্লাস্কের চা সব ফুরিয়েছে অনেক আগেই।কী দিয়ে চাঙ্গা রাখি নিজেদের বুঝে উঠতে পারি না।এখনও ক্যাম্পের নিশানা কিছু নেই।নীচে মেঘপরিকীর্ণ পারে-ছু বেসিন নিসর্গ ছবির মতো, সে আরও বিস্তৃত, আরও রহস্যময়।নদী আমাদের কাছ থেকে বহুদূরে সরে গেছে, সে উল্টোদিকের গিরিশিরার কোল ছুঁয়ে বইছে।অতিদূরের পূবে আর একটি বাঁকের আভাস।জানিনা, ঐ বাঁক ছাড়িয়ে যেতে হবে কিনা।স্যাক থেকে হেড-টর্চ বের করি, যদি নাইট-ট্রেক চলে কাজে লাগবে।ছ’টা নাগাদ মেঘ সরে গেল।আমরা নেমে এসেছি জানুদেশে।হঠাৎ নীচে একফালি এলোমেলো সবুজের গালিচা দেখতে পেলাম যেন।আর একটু কাছে যেতে জেগে উঠল নানা রঙের তাঁবুঘর।একটা গ্রাম।আর ভুল নেই, আমরা পৌঁছে গেছি আজকের মতো।হাতের কাছে ক্যাম্প, দ্রুত পায়ে ময়দানে নেমে আসি।যখন ক্যাম্পসাইটে পৌঁছে ভরতের কাছ থেকে গরম স্যূপের মগ হাতে নিলাম, ঘড়িত চোখ পড়ল।পৌনে ছ’টা।তারপর সবাই মিলে লাল তাঁবুতে।ম্যাগনাম সাইজের মগে বারে বারে পানীয় আসছে।স্যূপ, কফি, কমপ্ল্যান…।সঙ্গে নিউ মার্কেটের রকমারি স্ন্যাক্‌স।এবার মনে হ’ল টিম ভাল কন্ডিশনে আছে।সবাই ক্লান্ত, তবু চোখে মুখে খুশি লুকোনো যাচ্ছে না।ডিনারের ফরমায়েশ চলে গেছে কিচেনে।সেখানে ব্যস্ততার হাঁক ডাক, আবার গানের কোরাস।আজ নেপালিরাও গুলজারে মেতেছে।

||সমাপ্ত||

 

Share

TD ADMIN

Leave a Reply